শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

ভয় দেখাবার সংস্কৃতি!

ভয় থেকে মুক্তি আমাদের কবে মিলবে? ১৯৪১ সালের ৬ জানুয়ারি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি রুজভেল্ট তাঁর স্টেট অব ইউনিয়ন ভাষণে যে ‘ফোর ফ্রিডমস’ বা চারটি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করেন, তার মধ্যে ছিল-মতপ্রকাশ ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা এবং দারিদ্র্য ও ভয় ভয় থেকে মুক্তি। আর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ কর্তৃক যে সর্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণা দেয়া হয়, সেখানে এ ‘ফ্রিডম ফ্রম ফেয়ার’-এর কথাও বলা হয়। কেননা ভয় তথা ভয়ের পরিবেশ যে কোনও সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রতির পথে বাধা। ভয়ভীতির মধ্যে থেকে মানুষ সুষ্ঠু ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকবার কথা চিন্তা করতে পারে না। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তৃতীয় বিশ্ব তথা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আজ ভয়ের সংস্কৃতি জেঁকে  বসেছে মারাত্মকভাবে। সেখানে পদে পদে বিরাজ করছে ভয়, উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা। বিশেষত ভয়ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতি থেকে তাদের যেন কোনও মুক্তি নেই। বাঁচার উপায় নেই।

বিভিন্ন দেশে নির্বাচনের সময় দেখা যায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা এমন ভাষায় কথা বলেন, যার মাধ্যমে প্রকারান্তরে ভোটারদের প্রতি ভয়ভীতি দেখানো হয়। যেভাবে পক্ষ-বিপক্ষ তুলে গালাগালি ও হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, তাতেও অনেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। উন্নয়নশীল দেশ তো বটে, সাম্প্রতিক কালে কোনও কোনও উন্নত দেশেও এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। শুধু নির্বাচনের সময় নয়, সারা বছরই উন্নয়নশীল বিশ্বের রাজনীতির একটা অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, হুমকি-ধমকির মাধ্যমে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা। এমন কথাও বলতে শোনা যায় যে অমুককে ও তাদের দোসরদের গ্রেফতার করা না হলে জনগণ আইন হাতে তুলে নেবে। 

অথচ একদা তাদের ওপরও আইন হাতে তুলে নেবার নজির রয়েছে। এতে তারা নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হন। এখন তাদের মুখে একই রকম কথার প্রতিধ্বনি কি শোভা পায়? এছাড়া ‘সমুচিত’ জওয়াব দেয়া হবে কিংবা অমুকের রাজনীতিতে কোনও জায়গা নেই এমন কথাবার্তায় জনমনে ভীতি ছড়ানো ছাড়া এর উদ্দেশ্যই-বা কী? এদিকে প্রতিপক্ষও কম কীসে? তারাও হুংকার ছাড়েন এ বলে যে, সাহস থাকলে তারা তাদের এলাকায় আসুন। এতে কেউ ফেরত যেতে পারবেন না। অর্থাৎ তারা প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবেন না। প্রতিপক্ষকে তারা পরগাছার সঙ্গে তুলনা করেন, যাদের নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। এভাবে রাজনৈতিক ময়দানে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে দেশে শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতাকে যে বিনষ্ট করবার অপপ্রয়াস চলে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। 

ভয়ভীতির সংস্কৃতি বজায় থাকলে কোনও দেশ রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি কোনও ক্ষেত্রেই সফল হতে পারে না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন: 

‘ভয় তার বাহিরেতে, /ভয় তার অন্তরে,

ভয় তার ভূত-প্রেতে / ভয় তার মন্তরে।’

 

অর্থাৎ উন্নয়নশীল বা অনুন্নত দেশগুলোতে ভয় কোথায় নেই? সবখানেই ভয় আছে-কম আর বেশি। এ ভয়ের পরিবেশের সঙ্গে অনেক সময় জড়িত থাকে ভূরাজনীতিও। তাই এ ভয়কে জয় করতে হলে গণতান্ত্রিক আচরণের কোনও বিকল্প নেই। এ জন্য সর্বত্র পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমাদের মানসিক ও আবেগীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শিতার পরিচয় দেয়া। অন্যের অধিকারের প্রতি সজাগ ও সচেতন থাকা। নতুবা আমরা ভয়ের সঙ্গে বসবাসের দুর্ভাগ্য থেকে কখনও মুক্তি পাবো না। এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল বিশ্বের জাতীয় নেতৃবৃন্দ যতই শুভবুদ্ধির পরিচয় দেবেন, ততই মঙ্গল। অন্যথায় ভয়ে ভয়ে আমরা জাতি হিসেবে চুপসে যেতে থাকবো। মাটির সঙ্গে মিশে যাবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ